স্মৃতিবিলাস – ষষ্ঠ পর্ব

0

পঞ্চম পর্বের পর…

 

সুবিশাল রাস্তা দিয়ে ধীর লয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের ছোট মাইক্রোবাসটি, গন্তব্য মক্কা থেকে মদিনা। বাবা-মা (শ্বশুর-শাশুড়ি), অনু আর আমি, সব মিলে অদ্ভুত ভালোলাগা এক ভ্রমণ। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঠিক কতক্ষণ বুঝতে পারছি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠলাম, হায় হায়! আমি যে কিছুই দেখতে পেলাম না, এই অপার সৌন্দর্য এভাবে হারালাম ঘুমের রাজ্যে। মা পাশ থেকে সহানুভূতি মিশিয়ে বললেন, সবই এই একইরকম, কিছুই হারাওনি তুমি। আমি তবু সতর্ক দৃষ্টিতে সবকিছু দেখার চেষ্টা করছি, আর যেন কিছু মিস না হয়। সামনের দিকে সোজা তাকালে মনে হচ্ছে, দুই পাশে পাহাড়গুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটু ভাঁজ হলেই তাদের জরিমানা গুণতে হবে। আকাশটা বড্ড বেশি স্বচ্ছ আর সুন্দর! নীলের মাঝে গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ, তাদের কেউ কেউ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের সাথে গল্প করছে, কেউ কেউ আবার ছুটে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে, যেন প্রিয়জনকে কথা দিয়েছে, সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরবো।

প্রতিমুহূর্তে রাস্তাটা এমনভাবে বাঁক নিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে যে, মনে হচ্ছে এখানেই পথের শেষ, সামনে এগোনোর কোন উপায় নেই, কেবল অনন্ত আসমান আর জমিন। একটু আগেও সামনের সব পাহাড়গুলো একই রঙের ছিলো, কালো কালো বিশাল আকারের কয়লার স্তুপের মতো। মনে মনে ভাবছি, আসলেই কি এগুলো কয়লার তৈরী?  হঠাৎ ডান দিকে চোখ পড়লো, ডানের পাহাড়গুলো সব সোনালী হয়ে গেছে, শেষ বিকেলের সোনামাখা রোদ মেখে মায়াময় স্বর্নালী রূপ নিয়েছে। দ্রুত বামে তাকালাম, ওপাশটা আসমানী রঙ মেখেছে যেন। দারুণ তো! মেঘ পাহাড়ের এতো ভাব? যখন তখন মেঘ পাহাড়কে রাঙিয়ে দিচ্ছে ভালোবাসার নানান রঙে। একটু আগেই বাবাকে জিজ্ঞেস করছিলাম- ‘বৃক্ষহীন, বৃষ্টিহীন এই নগরীতে নিয়মিত বসবাস করা খুব কঠিন ব্যাপার হবে, তাই না?’

ওমা! কিছুক্ষণ পরেই অনু বললো, “দেখো দেখো বৃষ্টি।”

তাকিয়ে দেখি গাড়ির সামনের গ্লাসের উপর কয়েক ফোটা জলের কণা টপটপ করে ঝরে পড়ছে, যেন বিদ্রুপ করে আমায় বলছে- ওভাবে কেন ভাবছো, আমাদের এখানেও বৃষ্টি হয়!

যদিও শব্দহীন বৃষ্টির কণাগুলো মাটিতে পড়ার আগেই যেন গরম বাতাস তাদের ছিনিয়ে নিলো। খানিক পরে চোখে পড়লো কয়েকটা ছোট খাট খেজুর বাগান। বুঝলাম, একেবারে বৃক্ষহীন, বৃষ্টিহীন নয়। আর কম বলেই একধরণের বিরল সৌন্দর্য রয়েছে তাদের মাঝে। চলতি পথে দু’একটা নগরীর দেখা পেলাম, পাহাড়ের কোল ঘেষে গড়ে উঠেছে, তাই হয়ত ঐ বিশাল পাহাড়ের পাশে ঘরবাড়িগুলোকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হলো। সূর্য থেকে যেনো আগুন ঝরে পড়ছে। দূরের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যাস্তের রক্তিম আভা। পুরো আকাশটা সোনারঙে সেজেছে। চোখের পলক ফেলতে ইচ্ছে করছে না, প্রতিটি মুহুর্ত রঙ বদলে নতুন রূপে সাজছে। ওয়াও, এখন আবার রক্তিম আভা যেনো পুরো মরু পথটাকে রক্তিম করে তুলেছে!

সন্ধ্যা নেমে আসছে, চারপাশটা এখন ছাই রঙা লাগছে। কিছু দূরে বাতি জ্বলে উঠছে, আমরাও প্রায় এসে গেছি আমাদের গন্তব্যে। হঠাৎ করেই মনটা খুব বিষণ্ন হয়ে গেলো, মরুর বুকে ছুটে চলা বিকেলটা এভাবে শেষ হয়ে গেলো? আর কি কোনদিন দেখা হবে, এমন রূপময় কোন বিকেলের সাথে!

সোনার মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়া কী যে ভীষণ কষ্টের, তা সত্যিই বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। তবু স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা…। সন্ধ্যা ছয়টায় হোটেল ছেড়ে দিতে হবে, আসর নামাজ শেষে দ্রুত রুমে এসে সব গুছিয়ে নিলাম। বাবা, মা, অনু সবার চোখে মুখে বিষণ্নতার ছায়া। মনে পড়লো প্রিয় একটি কবিতার লাইন-

“চলে যেতে হবেই যখন জানো,

তবে কেন করেছো এ অন্ধ আয়োজন।”

 

লবিতে ব্যাগপত্র রেখে মসজিদে নববীতে এবারের মত শেষ মাগরিব ও এশা আদায়ের জন্য গেলাম। নামাজ শেষ করে এসেই শুনি ড্রাইভার ট্যাক্সি নিয়ে অনেক আগেই এসে আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে। বিষণ্নমনে গাড়িতে উঠলাম, চারিদিকে মন মাতানো বাতাস খেলা করছে, শীতল হাওয়ায় মনপ্রাণ জুডিয়ে যায়। ভেবে পাই না, যেখানে চারদিকে তাকালে কঠিন পাথরের বড় বড় পাহাড় ছাড়া আর তেমন কোন বৃক্ষরাজি চোখে পড়ে না, সেখানে বাতাস কিভাবে এত নির্মল হতে পারে! ঠিক যেন বসন্তের প্রথম মাতাল সমীরণ।

 

রাত নয়টায় জেদ্দা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। অনু সামনের সিটে বসেছে, বাবা-মা মাঝে আর আমি পেছনের তিন সিট নিয়ে একাই, সাথে বংলাদেশ থেকে বয়ে নিয়ে আসা আমার মিনি কোলবালিশ, সবখানেই সবসময়ে সে আমার সঙ্গী ছিল। পেছনে একটা কাপড়ের ব্যাগ ছিল, তার উপর মিনিটাকে দিয়ে শুয়ে পড়ি, নিমিষেই ক্লান্ত চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে । মসৃণ পথে গাড়ির নির্বিঘ্নে ছুটে চলা, মাঝে মাঝে একটু আধটু ঝাঁকুনির তালে ঘুম যেন আরো জাকিয়ে বসে চোখের পাতায়। সবার ডাকাডাকিতে অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকাই, ঘড়িতে দেখি রাত তিনটা। খাওয়ার জন্য একটা রেস্টুরেন্টের সামনে নামা হলো, এত রাতেও খাবারের জন্য মানুষের বিশাল লাইন, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ড্রাইভার বললো, অনেক দেরী হবে এখানে। বরং সামনে ভালো কোন রেস্টুরেন্টের সামনে নামাবো আপনাদের।

 

আবার যে যার নির্ধারিত সীটে বসে যাত্রা শুরু, আমি এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট না করে আবার শুয়ে পড়ি, আপন ভাবনায় বন্ধ হয়ে যায় চোখের পাতা। কিছুক্ষণ পর আবার ডাকাডাকি। এবারের রেস্টুরেন্টটা বেশ বড় তবে একটু অগোছালো মনে হলো। অর্ডার পাবার পর খাবার রান্না করে দেবে। অনু ভেতরে সবকিছু দেখে এসে বললো, “মাছের ফ্রাই, মুরগীর কাবাব হবে তবে রান্না করে দিতে একটু সময় লাগবে।”

আমার তখন ‘সবার উপরে ঘুম সত্য, তাহার উপরে নাই’ এমন অবস্থা। আমতা আমতা করে বললাম- ‘এত রাতে মাছ খেতে কি কারও ভালো লাগবে?’

‘তাহলে বার্গার খাবে?’

‘হুম, তা খাওয়া যেতে পারে।’

আমরা মাঝরাতে বার্গারের জন্য অপেক্ষা করছি, বেশ কিছুক্ষণ বাদে অনু ফিরে এলো স্যুপ নুডুলস আর চা নিয়ে। ড্রাইভারসহ পাঁচ জন মিলে গোগ্রাসে সেটাই খাওয়া হলো। পুনরায় যাত্রা শুরু।  আমার অবস্থা এবারও আগের মতো। ভোররাত প্রায় চারটার দিকে জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছি। ধীরগতিতে ইমিগ্রেশনের নিয়মকানুন শেষ করে সাড়ে পাঁচটায় ভেতরে প্রবেশ করি। বাবা মাকে সাথে নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করি। তারপর বাংলাদেশ বিমান ছয়টার সময়সূচি ভেঁঙ্গে পৌঁনে সাতটায় যাত্রা শুরু করে।

মনখারাপের একটা বিশাল পাহাড় বুকের উপর চেপে আছে, যেন জান্নাতের সুখ-শান্তি ফেলে আবার ফিরে যাচ্ছি দুনিয়ার কর্মব্যস্ত জীবনে!

১১/০১/২০২১

 

চলবে…

 

আপনার মন্তব্য

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না