আহমেদ দীন রুমির ‘সাইরাস’ ; ধর্ম, জাতি ও রাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক চারিত্রিক আখ্যান

0

 

কিতাব: সাইরাস (একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা ও মুক্তিদাতার জীবন)
লেখক: আহমেদ দীন রুমি
প্রকাশনী: আদর্শ

 

সাইরাস এমন এক চরিত্র, যার জীবনী আলেকজান্ডারকে বিশ্বজয়ে প্ররোচিত করেছে; ঐতিহাসিক সানজুর ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’র বাস্তব প্রতিনিধি। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও একাধিক নবীর ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে আবির্ভূত সাইরাস— তাঁর জন্ম, বেড়ে উঠার যে অপূর্ব রোমাঞ্চকর কাহিনী প্রচলিত তার সাথে বেশ মিল পাওয়া যায় নবী মুসার।

নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে সম্পর্কে নানা— অস্তাইজেসকেও পাত্তা না দিয়ে তুলনামূলক সামান্য শক্তি নিয়েই বিদ্রোহ করেছে— যখন অস্তাইজেসের মতো বিশাল সৈন্যবাহিনী ও সম্পদের মোকাবেলা করার মতো দম নেই পৃথিবীর তেমন কারো। মিদীয়রা যখন ক্ষমতার জোরে পারসিকদের দাস হিসেবে ট্রিট করছে তখন মায়ের দিক থেকে মিদীয় আর বাবার দিক থেকে পারসিক সাইরাস ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অদ্ভুত সাহস আর খোদার উপর তাওয়াক্কুলের উপর ভর করে অস্তাইজেসকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় এবং ধরাশায়ী করে শেষ পর্যন্ত। অস্তাইজেসের স্বৈরাচারী জুলুমের বিরুদ্ধে সাইরাসের প্রতিবাদী ইনসাফের এই বিজয়ের মাধ্যমে মূলত সভ্যতার ইতিহাসে সূচনা হয় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের; যার মূলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাইরাস।
অস্তাইজেসের বিরুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে বিসমিল্লা করা সাইরাস কিভাবে বিশ্বজয়ের সফরে অগ্রসর হলো, কিভাবে হয়ে উঠলো বিশ্বমানবতার ত্রাণকর্তা তার পুরো আখ্যান ব‌ইটাতে বিবৃত। এখন আমরা আলোচনা করবো শিরোনামে দেওয়া তিনটি প্রসঙ্গে: ধর্ম, জাতি ও রাষ্ট্রনীতি— অবশ্যই সাইরাসের কার্যক্রম অনুসারে।

 

ধর্ম
খ্রিস্টপূর্ব সময়ে হাজার বছরের রাজ্য, রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসের সাথে উতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল ধর্ম। দেবতাদের তুষ্ট করতে হতো স্থানীয় জনগণদের শাসক হিসেবে; এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর প্রভুত্ব কায়েম রাখতেও দেবতাদের সাথে— মন্দির, গির্জা, অলৌকিক স্থান— এসবে নিয়মিত কুরবানী, ভোজের আয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের সাথে যুক্ত থাকতে হতো। অন্যথায় নেমে আসতো দুর্ভোগ! সাইরাস এই ব্যাপারে ছিলেন সদাসতর্ক। যেখানেই গিয়েছেন, বিজয় অর্জন করেছেন সেখানেই প্রচলিত ধর্মীয় পদ্ধতিতে নব-উদ্যম আনতে চেষ্টা করেছেন। এবং লেখক এই ব‌ইতে দেখিয়েছেন, সমসাময়িক অন্যান্য রাজাদের পরাজয়ের পিছনে স্থানীয় ধর্মের প্রভাব কতটা কার্যকর ছিল। তবে, এখানে সাইরাসের একটা বিশেষত্ব হচ্ছে— তাঁর সাময়িক অন্য কোনো শক্তিশালী রাজা যখন কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে অদৃশ্য খবরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন তখন তিনি কেবল দৈববাণীতেই নির্ভর না থেকে নিজের এবং বিজ্ঞ পরিষদের পরামর্শকেও আমলে নিচ্ছেন— সমসাময়িক সকল শক্তিশালী রাজার উপরে তাঁর কৃতিত্বের পেছনে এটা অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

 

জাতি
কুরআনে যে ‘মাজমাউল বাহরাইন’ পরিভাষা এসেছে তা নিশ্চিতভাবে ব্যবহার করা যায় সাইরাসের সাথে— সে মাতৃগত মিদীয় এবং পিতৃগত পারসিক।‌ সাইরাস যখন অস্তাইজেসকে চ্যালেঞ্জ করছে তখন আসলে তাঁর বিরুদ্ধে অস্তাইজেসের চেয়েও বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মিদীয় এবং পারসিক জাতির পারস্পরিক দোটানা— মিদীয়রা তখন অস্তাইজেসের অধীনে পারসিকদের যেভাবে দাসের সম্মান দিচ্ছিল তখন সাইরাসকে সহযোগিতা করা অনেকের মনোভাব ছিল, সাইরাস বিজয় অর্জন করলে মিদীয়রা হবে পারসিকদের দাস; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নজিরবিহীন ঘটনা— সাইরাস কাউকেই কারো দাস বানাননি, সকলকে নাগরিক হিসেবে সমান সমাদর করেছেন এবং তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনায় মিদীয় এবং পারসিক উভয় জাতির বিজ্ঞদের অভূতপূর্ব সঙ্গম হয়েছিল। কেবল মিদীয় বা পারসিক নয়; লিডীয়, ব্যবিলনীয়, ইহুদি প্রমুখ অন্যান্য জাতির উপরেও সাইরাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হ‌ওয়ার পর‌ও তাদেরকে জাতি হিসেবে— ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক— স্বাধীনতা দিয়েছেন, কোনো জাতিকেই দাস হিসেবে ট্রিট করতে নারাজ ছিলেন সাইরাস। এবং সেজন্যই লেখকের চতুর মন্তব্য “তিনি ভূখণ্ড জয় করেননি, করেছেন সেখানকার নাগরিকদের” (ভূমিকা)।

 

রাষ্ট্র 
একটি আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হবে ইনসাফ— বিজ্ঞ সাইরাস তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনায় এই বৈশিষ্ট্য অক্ষরে অক্ষরে পালনে ব্যর্থ ছিলেন না। মূলত, অস্তাইজেসের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়েই মিদিয়ার অভিজাত ব্যক্তিবর্গ সাইরাসকে ফুঁসলিয়েছেন— সাইরাস‌ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই জীবন-যুদ্ধে নেমেছেন। কেবল মিদীয় নয়, বরং তাঁর বিজয়ী প্রতিটি রাজ্যেই দেখা গেছে শাসকের জুলুম। সিয়াসতনামায় নিজামুল মুলক লিখেছেন, “ধর্মহীন রাজ্য চলতে পারে, কিন্তু বে-ইনসাফী রাজ্য চলতে পারে না”— তদ্রূপ সমসাময়িক জালেম শাসকদের রাজ্য‌ও টিকেনি বেশিদিন; ন্যয়বিচারের প্রতিমূর্তি সাইরাসের সামনে তাই অকপটে ভেঙে পড়ে তাদের প্রাচীর। ন্যয়বিচার নিশ্চিত করতে সাইরাস সৃষ্টি করে “রাজচক্ষু” পদ— যে পদে থাকা ব্যক্তির একমাত্র দায়িত্ব ছিল, স্থানীয় জনগণের উপর সাইরাসের কোনো প্রতিনিধির জুলুম হলে সঙ্গে সঙ্গে সাইরাসকে খবর দেবে। এভাবেই সমসাময়িক পৃথিবীর অপ্রতিরোধ্য বিজেতা হিসেবে সাইরাস সৃষ্টি করেন ইনসাফের ইতিহাস— যা তাঁকে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সনদ দেয়।

 

কিতাব 
এই কিতাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ব্যক্তি সাইরাসকে কেবল ব্যক্তি হিসেবে না দেখে খোদার প্রতিশ্রুত ইনসাফের প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে দেখা। লেখক কেবল সাইরাসেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সাইরাস কোথায় অভিযান করছেন, সেখানকার ধর্ম ও সংস্কৃতি, রাজার শক্তি ও দুর্বলতা এবং সাইরাস কিভাবে তাকে কাবু করছে— মোটাদাগে বলা যায়, সাময়িক পৃথিবীর একটা ‘মানচিত্র’ লেখক দাঁড় করিয়েছেন। যার কারণে, ঐ সময়ের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা সত্ত্বেও পাঠক কোথাও হোঁচট খাবেন না— লেখকের পরিশ্রম অনস্বীকার্য।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আড়াই হাজার বছর পরেও সাইরাসের উপযোগিতা আসলে আছে কি-না! অবশ্যই আছে। কারণ আগেই বলা হয়েছে এবং ব‌ইতে লেখক দেখিয়েছেন, সাইরাস আসলে একক কোনো ব্যক্তি নন, তিনি জালেমের দুনিয়ায় মজলুমের প্রতিনিধি, স্বৈরাচারী শোষকের আস্তানায় জনগণের আক্রোশ— বলা যায়, একটি প্রতীক। জালেমের অধীনে থাকা মজলুমের ভেতরে জমে থাকা আক্রোশকে টেনে বের করে আনতে দারুণ কার্যকরী সাইরাস, স্বৈরাচারী শোষকের শোষণে নিষ্পেষিত জনগণের নিকট প্রতিরোধের ঝাণ্ডা উঠিয়ে দিতে পারেন সাইরাস। এবং সেজন্যই ফ্যাসিবাদের এই দুনিয়ায়, বে-ইনসাফের স্বর্গে সাইরাস হয়ে উঠতে পারেন ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র— ইনসাফের পতাকা।
আপনার মন্তব্য

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না